Image

চুরির অপবাদ সইতে না পেরে ফল ব্যবসায়ীর আত্মহত্যা

সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি: গরু চুরির অপবাদে মসজিদের মাইকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দেওয়ায় লজ্জা ও ক্ষোভে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে দুই সন্তানের জনক রোকনুজ্জামান (২৮) নামে এক ফল ব্যবসায়ী আত্মহত্যা করেছেন।

শনিবার (১০ জানুয়ারি) সকাল ৭ টায় নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাখুলী গুয়াবাড়ী এলাকায় ওই ঘটনা ঘটে।

তিনি ওই এলাকার দিনমজুর জহুরুল ইসলাম বাট্টুর ছেলে। খবর পেয়ে থানা পুলিশ দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে  লাশ উদ্ধার এবং প্রাথমিক সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে মরদেহ থানায় নিয়ে এসেছে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নীলফামারী মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। 

জানা যায়, শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সকালে ওই এলাকার আজিজার রহমানের পুত্র মোসলেম (২৮) ফল ব্যবসায়ী রোকনুজ্জামানকে জোরপূর্বক সাথে নিয়ে পার্শ্ববর্তী কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের পশ্চিম বেলপুকুর এলাকার বানিয়াপাড়ার বাবুর ছেলে আব্দুর রশিদের একটি গরু চুরি করে।

পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় রাতেই তিনপাই কুড়ারপাড় এলাকার একটি বাড়ি থেকে গরুটি উদ্ধার করা হয়। 

গরুটি উদ্ধারের পর ওইদিন রাত ১১ টার দিকে স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ গণমান্য ব্যক্তিদের  নিয়ে চুরির বিষয়ে বৈঠক করে ২২০০ টাকা জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে লিখিতভাবে মিমাংসা করা হয়।

কিন্তু শনিবার (১০ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ৬ টার দিকে আব্দুর রশিদ রোকনুজ্জামানকে গরু চোর হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁকে সমাজচ্যুত করতে একই এলাকার মাঝাপাড়া রহমতিয়া জামে মসজিদের মাইকে ঘোষণা করেন। একই সাথে মূল অভিযুক্ত  মোসলেমেরও নাম ঘোষণা করেন তিনি।

অনিচ্ছাকৃত ঘটনায় জরিমানা দেয়ার পরও এভাবে চোর বলে মাইকে নাম ঘোষণা করার নাম রোকনুজ্জামান নিজ কানে শুনতে পারায় লজ্জা ও ক্ষোভ ভেঙ্গে পড়েন তিনি। বিষয়টি সহ্য করতে না পেরে পরে কৌশলে তিনি তাঁর স্ত্রী আবিয়া খাতুনকে সকালের নাস্তার জন্য দোকান থেকে আটা কিনতে পাঠান। এরই ফাঁকে নিজ ঘরে গিয়ে ওড়না দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। 

তার স্ত্রী কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, দোকান থেকে এসে দেখি ঘরের দরজা বন্ধ। অনেক ডাকাডাকির পরও কোন সাড়া না পেয়ে বাড়ির লোকজনের সহযোগিতায় দরজা খুলে দেখতে পাই সে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ঘরের তীরে ঝুলছে। সকালে মসজিদে আব্দুর রশিদ মাইকিং করার পরেই লোক লজ্জায় ও ক্ষোভে সকাল ৭ টায় গলায় ফাঁস লাগিয়ে আমার স্বামী আত্মহত্যা করেছে। তিনি তাঁর স্বামীকে আত্মহত্যার প্ররোচনায় মৃত্যুর জন্য জড়িতদের বিচার দাবি করে বলেন, মিমাংসার পর কেন আবার মাইকিং করা হলো? তাও আবার রশিদের নিজ এলাকায় না করে আমাদের এলাকায় এসে আমাদের বাড়ির পাশের মসজিদে। এটা আত্মহত্যা নয়, বরং অপবাদ দিয়ে প্ররোচনার মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। 

রোকনুজ্জামানের বোন নিতুন বলেন, আসল অভিযুক্ত মোসলেম আমার ভাইকে ভুল বুঝিয়ে জোর করে গরু চুরি করতে নিয়ে যায়। গরু উদ্ধারের পর রাতে সালিশ বৈঠকে জরিমানাও আদায় করে গরুর মালিক আব্দুর রশিদ। তারপরেও ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ভাইকে সমাজে হেয় করতে রশিদ ও মোসলেম ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মসজিদে মাইকিং করেছে। তাদের কারণেই আমার ভাই মারা গেছে। এর বিচার চাই। 

এলাকাবাসী জানান, রোকনুজ্জামান অত্যন্ত সহজ সরল। তিনি শহরে ফলের ব্যবসা করে আসছিল। মসজিদে মাইকিং এর কারণেই লোকলজ্জায় তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাঁর অবুঝ দুই সন্তান ইমরান ও রোকেয়ার কি হবে এখন? এ প্রশ্ন সকলের। তারা আত্মহত্যার প্ররোচক আব্দুর রশিদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গরুর মালিক আব্দুর রশিদ বলেন,আমার চুরি যাওয়া গরু উদ্ধারের পর রাতেই জনপ্রতিনিধিসহ সকলের সামনে মীমাংসা হয়েছে। সকালে শুধু সবাইকে সচেতন করতে মসজিদে মাইকিং করা হয়েছে। বিষয়টি মীমাংসার পর কেন মাইকিং করলেন জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দিতে পারেননি। 

 

সৈয়দপুর থানার উপ পরিদর্শক মনিরুজ্জামান মনির বলেন, লাশ উদ্ধার করে প্রাথমিক সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। গলায় ফাঁসের চিহ্ন রয়েছে। 

থানার অফিসার ইনচার্জ মো.  রেজাউল করিম রেজা বলেন, লাশের ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে ইউডি মামলা হয়েছে। 

লিখিত অভিযোগ পেলে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।